রাশির বিভিন্ন স্থানে সূর্য ও শনির সংযোগ

সূর্য ও শনির সংযুক্তি বৈদিক জ্যোতিষশাশ্ত্রের অন্যতম ভয়ঙ্কর সংযোগ। উভয় গ্রহই একে অপরের চরম শত্রু। আমাদের একটা সাধারণ ধারণা আছে যে কুষ্টিতে এই সংযোগ খুবই অশুভ। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে প্রতি বছর এক মাসের জন্য শনি ও সূর্য কোনো একটি নির্দিষ্ট রাশিতে মিলিত হয়। এই এক মাস সময়কালে যেই জন্মগ্রহণ করুক তার কুষ্টিতে সূর্য ও শনির সংযোগ থাকে।

রাশির বিভিন্ন স্থানে সূর্য ও শনির সংযোগ নিয়ে আলোচনা করবার আগে দেখা যাক জ্যোতিষশাশ্ত্রে সূর্য ও শনি কাকে কাকে সূচিত করে।

সূর্য হল গ্রহ জগতের রাজা। এটি প্রচন্ড উষ্ণ, শুষ্ক এবং অগ্নির উপাদানকে সূচিত করে। কেউ সূর্যের কাছে যেতে সাহস করে না। এটি দম্ভ ও অহংকারে পূর্ণ। এটি আমাদের আত্মাকে সূচিত করে। এটি সম্মান, পরিচিতি, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দান করে। আধুনিক যুগে এটি শাসক/ সরকারকে সূচিত করে।

শনি হল শীতল এবং অত্যন্ত ধীর গতির গ্রহ। এটি নিয়মানুবর্তিতা, গঠন, কঠোর পরিশ্রম প্রভৃতিকে সূচিত করে। এটি বায়ুর উপাদান এবং সমাজের শ্রমজীবী বা দরিদ্র/ বঞ্চিত মানুষকে সূচিত করে। এটি একজন কড়া শিক্ষক যিনি শাস্তির মধ্য দিয়ে শিক্ষা দেন এবং ব্যক্তিকে জীবনের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করান। এটি দর্শন ও অধ্যাত্মবাদেরও ইঙ্গিত বহন করে। শনি কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটি আমাদের কৃতকর্মের ফল দেয়। কেউ শনির হাত থেকে নিস্তার পায় না, এমনকি ভগবানও নয়। এটি কর্মজীবনকে সূচিত করে। সুতরাং শক্তিশালী ও পীড়িত না হওয়া শনি কর্মজীবনের উন্নতিতে সাহায্য করে।

এখন পৃথক পৃথক স্থানে সূর্য ও শনির সংযোগ নিয়ে আলোচনা করা যাক। এই ফল একইভাবে সত্যি হয় যখন সূর্য ও শনি স্থান বিনিময় করেন যেটি সূর্য ও শনির মধ্যে পরিবর্তন যোগ ঘটায়। সূর্য হলেন শনির পিতা। কোনো পিতাই পুত্রের সঙ্গে শত্রুর ন্যায় ব্যবহার করেন না কিন্তু পুত্র পিতার সঙ্গে শত্রুর ন্যায় ব্যবহার করতে পারে। সুতরাং এই সংযোগে সূর্য শনির থেকে বেশি কষ্টভোগ করেন। সেইজন্য যেসব ব্যক্তির এই সংযোগ আছে তারা কর্মজীবন নিয়ে ভুক্তভোগী হন।

সূর্য ও শনি  শত্রু। সূর্য যদিও শনির পিতা তবুও পিতা-পুত্রের সম্পর্ক মধুর নয়। সূর্য ও শনি উভয়েই একে অপরকে শত্রু বা তিক্ত প্রতিপক্ষ বলে গণ্য করেন। যেখানে সূর্য দিব্য আলোর প্রকাশ দেয় সেখানে শনি অন্ধকার ও বিষন্নতাকে প্রকাশ করে। উভয়েই চরম শত্রু। কিছু ঘটনার থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে উচ্চস্থ ও নীচস্থের রাশি একে অপরের বিপরীত হয়। সূর্য হল একটি অগ্নিসদৃশ গ্রহ এবং শনি একটি চপল গ্রহ। তিনি গ্রহের কক্ষে সেবক হিসেবে পরিচিত। গ্রহগুলির প্রাকৃতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে শনির স্থান সবথেকে শেষে হয়। তাকে সবথেকে কম ক্ষমতা নৈসর্গিক বলের অধিকারী বলে ধরা হয়।

বৈদিক পুরাণে শনি হলেন সূর্য ও তার পত্নী ছায়ার পুত্র। শনি হলেন খোঁড়া কারণ সূর্যের প্রথম পত্নী সঞ্জনার সন্তানদের মধ্যে একজন ক্রোধের বশে তার পায়ে আঘাত করেছিল। সেইজন্য তিনি থেমে থেমে চলেন এবং তাই তিনি গ্রহের মধ্যে ধীরতম গ্রহ। এই শত্রুতার পিছনে সম্পূর্ণ পৌরাণিক কাহিনীটি পড়ুন।

নীচে দেওয়া কুষ্টিতে সূর্য ও শনির সংযোগের ফল বেশি করে অনুভব করা যায় যখন উভয় গ্রহ ডিগ্রি অনুযায়ী একে অপরের কাছাকাছি অবস্থান করে। যদি একটি গ্রহ ১ ডিগ্রিতে থাকে এবং অপর গ্রহটি ২৯ ডিগ্রিতে থাকে তখন উভয় গ্রহ একই রাশিতে অবস্থান করলেও তার প্রভাব খুবই কম হবে। যখন সূর্য ও শনি পরস্পরের প্রতি দৃষ্টি দেয় অথবা যখন সূর্য শনির বিপরীতে থাকে বা সূর্য ও শনির মধ্যে পরিবর্তন যোগ ঘটে তখন নীচের ফল গুলি ব্যবহার করা যেতে পারে।

  • যেকোনো কুষ্টিতে সূর্য ও শনির সংযোগ হলে পিতার সঙ্গে মতের অমিল/ মতানৈক্য হয়। পিতা ও পুত্রের চিন্তা ভাবনা এক হয় না। পিতা ও পুত্রের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত ঘটতে পারে। সেই ব্যক্তি যার এই সংযোগ রয়েছে তিনি পিতার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশাগত জীবন বেছে নিতে পারেন। এমনকি যদি ৯ম স্থান ও ৯ম পতি পীড়িত হয় তবে সেই ব্যক্তি অল্প বয়সে তার পিতাকে হারাতে পারেন।
  • সরকার এবং নিম্নবিত্ত লোকেদের থেকে সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • সূর্য আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। যখন সূর্য শনির সঙ্গে সংযুক্ত হয় তখন তা ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসকে দমন করে ও কমিয়ে দেয়, বিশেষত যখন সূর্যও নীচস্থ হয়। সংযোগের স্থানের ওপর নির্ভর করে জীবনব্যাপী বিশৃঙ্খলা এবং বিপরীতধর্মী উভয়সঙ্কটের সৃষ্টি হয়।
  • যখন শনি সূর্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন তা ব্যক্তির মধ্যে অহংকার ও ঔদ্ধত্যের কারণ হয়। শনির কঠোর বাস্তবতার কারণে সূর্যের ব্যক্তিত্ব খর্ব/আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তারা অনুভব করেন যে তারা অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্যের দ্বারা ভারাক্রান্ত। এটি ব্যক্তিকে অল্পবয়সেই পরিণত করে তোলে। সূর্য ও শনির সংযোগ ব্যক্তিকে জীবনে কঠোর পরিশ্রম করায় বিশেষত সেই স্থানে যেখানে এই সংযোগ ঘটে।
  • শনি ভালো ফল প্রদান করে যদি এটি সেই স্থানে সূর্যের আগে বসে। এটি সমাজের সেবা করার জন্য একটি শুভ সংযোগ। সরকার, উকিল/আইনজীবী, বিচারপতি, সরকারি আধিকারিক এমনকি রাজনৈতিক নেতাদেরও ৬ষ্ঠ, ৭ম অথবা ১০ম স্থানে শনি ও সূর্যের সংযোগের দিক থেকে লক্ষ্য করা যেতে পারে। সূর্য ও শনির সংযোগ ঔষধ সংক্রান্ত পেশার জন্য শুভ।
  • ৭ম স্থানে সূর্য ও শনির সংযোগ হলে স্ত্রীর সাথে সম্পর্কে সমস্যা হতে পারে। যদি বিপরীতভাবে অবস্থান করে তখন তা মিথ্যা দম্ভের অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং বৈবাহিক জীবনে ও ব্যবসার অংশীদারের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে।
  • ৪র্থ স্থানে সূর্য ও শনির সংযোগ সম্পত্তি বিষয়ক ব্যাপারে পিতা ও পুত্রের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। যেহেতু ৪র্থ স্থান পারিবারিক সুখের স্থান, তাই ৪র্থ স্থানে শনি-সূর্য জুটি পারিবারিক সুখের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। এই স্থান শিক্ষারও স্থান। সুতরাং অশুভ স্থানের পতি সূর্য ও শনির সংযোগ ৪র্থ স্থানে ঘটলে তা প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে এমনকি মায়ের দুরারোগ্য/ দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধির কারণ হতে পারে।
  • যদিশনিওসূর্য২য়স্থানেঘনিষ্ঠভাবেসংযুক্তথাকেতবেসেইব্যক্তিঅনেকস্বাস্থ্যজনিতসমস্যারসম্মুখীনহতেপারেন। এই সংযোগ ব্যক্তির চোখের দৃষ্টিশক্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
  • যদি সূর্য এবং শনি, মেষ অথবা মকর রাশিতে মিলিত হয় তখন ব্যক্তি আরও বেশি ভুক্তভোগী হয়। যখন এই মিলন মিথুন রাশিতে ঘটে তখন এটি ততটা অশুভ নয়। মিথুন রাশি বুধ গ্রহের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সূর্য ও শনি উভয়েই বুধের প্রতি নিরপেক্ষ থাকে। উপরন্তু মিথুন মেধা, বুদ্ধি ও যোগাযোগের প্রতীক। সুতরাং এটি ততটা বিপরীত ফল প্রদান করে না। একইভাবে কুম্ভ হল বায়বীয় রাশি এবং শনির দ্বারা অধিকৃত। সুতরাং কুম্ভ রাশিতে সূর্য ও শনির সংযোগ ততটা অশুভ নয়। তুলা রাশিতে সূর্য ও শনির সংযোগ সম্পর্কে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে তুলা রাশিতে সূর্য ও শনির সংযোগ নীচভঙ্গ রাজযোগ সৃষ্টি করে যা সূর্যের নীচস্থ হওয়াকে রদ/বাতিল করে।
  • ১০মস্থানেসূর্যওশনিরসংযোগবস্তুগতপ্রত্যাশা/দৃষ্টিকোণেরজন্যখুবইশুভ। ১০মস্থানেসূর্যগতিপথেশক্তিঅর্জনকরেএবংশনিপেশাগতজীবনেরসূচকহয়েসর্বদাই১০মস্থানেশুভহয়।  এটিআপনাকেএমনএকটিপেশাদিতেপারেযেখানেআপনিসমাজেরজন্যলড়াইকরতেপছন্দকরবেন। এটিসরকারিচাকরিরপক্ষেওশুভ। কিন্তুএটিআবারঅফিসেবস/উর্ধতনকর্তৃপক্ষএবংপরিবারেশাশুড়িরসঙ্গেদ্বন্দ্বেরসৃষ্টিকরতেপারে।

 

  • ৯মস্থানে সূর্য ও শনির সংযোগ পিতার পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। যদি এই দুটি গ্রহ শুভ রাশিতে না থাকে অথবা পীড়িত হয় তখন উচ্চ শিক্ষায় সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। যেহেতু ৯ম স্থান ভাগ্য/অদৃষ্টেরস্থানএবংসবচেয়েশক্তিশালীত্রিকোণস্থান, তাইএইস্থানেএইরকমদুটিচরমশত্রুরঅবস্থানএকেবারেইঅনভিপ্রেতবাকাম্যনয়।
  • ১১তমস্থানেসূর্যওশনিরসংযোগআর্থিকপ্রাপ্তিরপক্ষেশুভ। কিন্তুএটিবড়ভাই-বোনেরসাথেমতানৈক্যসৃষ্টিকরতেপারে। ১১তমস্থানথেকেউভয়গ্রহইশিশুরজন্মেরস্থান৫মস্থানেরওপরদৃষ্টিদেয়। যদি৫মপতিদুর্বলহয়তখনশিশুরজন্মগ্রহণেসমস্যাহতেপারে।
  • ৬ষ্ঠ স্থানে সূর্য ও শনির সংযোগ অত্যন্ত শুভ। এটি আপনার শত্রুদের সম্পূর্ণরূপে বিনাশ করে। কোর্টে মামলা বা অন্য যেকোনো নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আপনি সহজেই জয়লাভ করবেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের জন্য এই সংযোগ উপকারী। কিন্তু লোন বা ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া আপনার মামা ও আপনার মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
  • ৮ম স্থানে সূর্য ও শনির সংযোগ যদি লাভজনকভাবে অবস্থিত হয় তখন তা ব্যবসা বা অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে সাফল্য আনতে পারে। কিন্তু এটিকে বৈবাহিক সুখের পক্ষে শুভ বলে গণ্য করা হয় না। শনি এবং সূর্য উভয় বিচ্ছেদমূলক গ্রহই যখন ৮ম স্থান অধিকার করে থাকে তখন যদি অন্য প্রশমক/নির্বাপক উপস্থিত না থাকে তবে বৈবাহিক জীবনে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এখন আমি একটা জিনিস স্পষ্ট করে দিতে চাই যে এই সংযোগের প্রভাব বিচার করার সময় আমাদের কর্তৃত্বের বিষয়ে ভুলে গেলে চলবে না। যদি সূর্য ও শনি ১ম, ৪র্থ, ৫ম, ৯ম এবং ১০ম প্রভৃতি শুভ স্থানের পতি হয় তখন নেতিবাচক প্রভাব কম এবং ইতিবাচক প্রভাব বেশি হয়। তাছাড়া বৃহস্পতির ন্যায় শুভ গ্রহের দৃষ্টি এই প্রভাবকে পরিবর্তন করে।

বৈদিক জ্যোতিষশাশ্ত্রে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে সূর্য-শনির সংযোগ, সূর্য ও শনির সমবেত দৃষ্টি এবং সূর্য ও শনির মধ্যে পরিবর্তন যোগ সম্বন্ধে কিছু তথ্য আমি আপনাদের দেওয়ার চেষ্টা করলাম। যদি আপনার আরও কিছু শেয়ার করার থাকে তাহলে নীচে কমেন্ট করুন। যদি আপনার কুষ্টিতে এই সংযোগ থাকে তাহলে আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.

Scroll to Top