জ্যোতিষশাস্ত্রে দ্বিতীয় বিবাহ

বর্তমান সময়ে /  সাম্প্রতিককালে একটি খুবই প্রাসঙ্গিক বিষয় হল দ্বিতীয় বিবাহ এবং সময়ের সাথে সাথে এটি পরবর্তী সময়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হতে চলেছে। আমাদের সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বিপজ্জনক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুতরাং আমরা দেখব যে জ্যোতিষশাশ্ত্রে কি ভাবে দ্বিতীয় বিবাহ গণনা করা হয়। প্রথম বিবাহের সময় গণনার সঙ্গে এর অনেক সাদৃশ্য/মিল থাকে কিন্তু স্থান গুলি পৃথক হয়।

এই অনুচ্ছেদে আমি আপনাদের ধাপে ধাপে জ্যোতিষশাশ্ত্রে দ্বিতীয় বিবাহের সম্ভাবনা নিশ্চিত করার কৌশল শেখানোর চেষ্টা করব এবং যদি সম্ভাবনা থাকে তবে সেই বিবাহের পরিস্থিতি ও সময় সম্বন্ধে সম্যক ধারণা দেবার চেষ্টা করব।

একমাত্র প্রথম বিবাহের সমাপ্তির পরেই দ্বিতীয় বিবাহের প্রসঙ্গ আসে। সুতরাং দ্বিতীয় বিবাহ নিয়ে আলোচনার পূর্বে কুষ্টিতে গ্রহের বিন্যাস দেখে নেওয়া যাক যা প্রথম বিবাহকে নষ্ট করে দিতে পারে।

আপনি আগ্রহী হতেপারেন :ভবিষ্যৎ সঙ্গীর চেহারা, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিভাবে জানবেন

বিবাহ গণনা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান সমূহ

লগ্নে ৭ম স্থান হল বিবাহের প্রধান স্থান।এটি যে শুধুমাত্র বিবাহের স্থান তাই নয়, এটি আমাদের জীবনের সমস্ত সম্পর্কের জন্য দায়ী। যেমন ৭ম স্থান বা পতি যদি ৮ম অথবা ১২তম স্থান বা পতির সঙ্গে যুক্ত থাকে তবে তা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কও ঘটাতে পারে। ৭ম স্থানে শুভ গ্রহের উপস্থিতি স্বামী স্ত্রীর মধ্যে স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের সূচনা করে। কিন্তু ৭ম স্থান বা তার পতি যদি পীড়িত হন তবে তা বৈবাহিক জীবনে দুর্ভোগের লক্ষণ। ৭ম স্থানে মঙ্গল, সূর্য, রাহুর মতো ক্ষতিকর গ্রহের উপস্থিতি সুখী দাম্পত্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর।

এরপর আমাদের ৮ম স্থানে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ৭ম স্থানের থেকে দ্বিতীয় হয়ে ৮ম স্থান স্বাস্থ্যকর বিবাহকে সূচিত করে এবং বিবাহের পক্ষে মারক হয়। যদি ৮ম স্থান বা তার পতি পীড়িত হন তবে বিয়ে ভেঙে যেতে পারে। ৮ম স্থানে মঙ্গল,রাহু,শনির মতো গ্রহের উপস্থিতি একটি বিবাহ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

২য় স্থান পরিবারের স্থান এবং সেইজন্য এটি লক্ষ্য করাও প্রয়োজন।

এই স্থান গুলি ছাড়াও আমাদের আরেকটি জিনিস লক্ষ্য করতে হবে এবং তাহল উপপদলগ্ন। উপপদলগ্ন হল ১২তম স্থানের অরুধাপদ।

কিভাবে উপপদ গণনা করবেন: ধরা যাক একজন ব্যক্তি মেষ লগ্নে জন্ম গ্রহণ করেছেন এবং তার ১২তম পতি বৃহস্পতি কর্কটে অবস্থান করছে। ১২তম স্থান মীন থেকে কর্কট ৫রাশি দূরত্বে অবস্থান করে। সুতরাং আমরা কর্কট থেকে ৫রাশি যোগ করব এবং তাহলে আমরা বৃশ্চিক রাশিতে পৌঁছব। বৃশ্চিক ঐ ব্যক্তির উপপদলগ্ন হবে।

উপপদ লগ্ন থেকে ২য় স্থান হল দীর্ঘ বৈবাহিক জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি উপপদলগ্নে ২য় স্থানে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব থাকে তখন জ্যোতিষশাশ্ত্রে বিবাহবিচ্ছেদ ও দ্বিতীয় বিবাহের সম্ভাবনা থাকে।

বিবাহের সম্ভাবনা/প্রত্যাশাকে বিবেচনা করার সময় আমাদের নভমসাকেও লক্ষ্য করে দেখতে হবে। নভমসা লগ্ন ও তার পতি এবং ৭ম স্থান ও তার পতিকেও লক্ষ্য করতে হবে। যদি নভমসায় ৭ম স্থান পীড়িত হয় তবে প্রথম বিবাহের ভেঙে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। যেমন যদি রাহু–কেতু নভমসার ১ম–৭ম স্থানে অবস্থান করে তবে বিবাহ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।

জ্যোতিষশাশ্ত্র অনুযায়ী বিচ্ছেদের জন্য দায়ী গ্রহ সমূহ

জ্যোতিষশাশ্ত্রে ,প্রথম বিবাহে বিচ্ছেদ না ঘটলে আমরা দ্বিতীয় বিবাহের জন্য এগোতে পারি না। জ্যোতিষশাশ্ত্রে মঙ্গল, রাহু,সূর্য এবং শনি হল বিচ্ছেদের প্রধান ও সক্রিয় কারণ। শনি বিচ্ছেদের পক্ষে সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। শনি ব্যথা–বেদনা দেয় কিন্তু কখনোই ব্যক্তিকে সম্পর্ক ভাঙতে বা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে দেয় না। যদি মঙ্গল,রাহু বা সূর্য ৮ম স্থানে অবস্থান করে তখন তা বিচ্ছেদের প্রবল লক্ষণ। কিন্তু আমি আপনাদের সাথে আমার অভিমত শেয়ার করতে চাই যে কুন্ডলীর যথার্থ মিলন বিচ্ছেদের সম্ভাবনা হ্রাস করতে পারে। কিন্তু আমি আমার প্রত্যেক লেখায় বারং বার উল্লেখ করেছি যে অষ্টকূট গুণের মিলন যথার্থ কুষ্টির মিলন নয়। আমি বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছি যে কিভাবে বিবাহের জন্য কুষ্টির যথার্থ মিলন ঘটানো যায়। একটা ধারণা পাওয়ার জন্য আপনার এটা পড়া উচিৎ।

বিবাহের সূচক শুক্রকে পীড়িত হতেই হবে নয়তো শক্তিশালী শুক্র একটি বিবাহকে রক্ষা করতে পারে।

বিচ্ছেদের জন্য দায়ী গ্রহের বিন্যাস সমূহ

এখন বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য কিছু নীতি সম্বন্ধে বুঝে নেওয়া যাক।

  • ৬ষ্ঠ স্থান হল শত্রু, সংগ্রাম এবং বাধা–বিপত্তির স্থান। এটি ১২তম স্থান অথবা বিবাহের হানিও বটে। ৮ম স্থান বাধা ও প্রতিবন্ধকতার স্থান এবং ৭ম স্থানের জন্য মারক স্থান। সুতরাং যখন ৬ষ্ঠ ও ৮ম পতি ৭ম স্থানে উপস্থিত থাকে তখন তা বৈবাহিক সুখের পক্ষে অশুভ যোগ হয়।
  •  ৭ম স্থানে রাহু, মঙ্গল,সূর্যের মতো ক্ষতিকারক উপস্থিতি বিচ্ছেদকে ইঙ্গিত করে। ৭ম স্থানে মঙ্গল কুন্ডলীতে মাঙ্গলিক দোষ সৃষ্টি করে। যদি সূর্য ৭ম স্থানে থাকে তাহলে সঙ্গী বা অংশীদারের মধ্যে দম্ভের লড়াই হতেপারে।
  • যদি ৭ম পতি নীচস্থ বা পীড়িত হন তবে তাও অসুখী বিবাহের ইঙ্গিত দেয়।
  •  ক্ষতিকর গ্রহের দ্বারা পীড়িত উপপদলগ্নের ২য় স্থান অথবা নীচস্থ গ্রহগুলি বৈবাহিক জীবনের ক্ষতি করে এবং বিবাহের পরিসমাপ্তি ঘটায়।
  •  যখন নভমসায় ৭ম স্থান শনি, রাহু/কেতু, মঙ্গল প্রভৃতি ক্ষতিকর গ্রহের দ্বারা পীড়িত হয় তখন বিচ্ছেদের সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল।
  • যখন বিবাহের সূচক শুক্র , রাশি ও নভমসা উভয় কুষ্টিতেই পীড়িত হয় তখন জ্যোতিষশাশ্ত্রে বিচ্ছেদের ইঙ্গিত বলে ধরা হয়।

জ্যোতিষশাস্ত্রে দ্বিতীয় বিবাহ

এখন আমরা জ্যোতিষশাশ্ত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য বিন্যাস বুঝতে পেরেছি। আমরা কুষ্টিতে দ্বিতীয় বিবাহ পরীক্ষা করে দেখতে পারি।দ্বিতীয় বিবাহকে কুষ্টির দ্বিতীয় স্থান থেকে দেখা হয়। ৮ম স্থান দীর্ঘ জীবন কে প্রদর্শন করে।সুতরাং ৭ম স্থান থেকে অষ্টম স্থান যেমন ২য় স্থান জ্যোতিষশাশ্ত্রে দ্বিতীয় বিবাহকে সূচিত করে। তৃতীয় বিবাহের জন্য আমাদের ২য় স্থান থেকে অষ্টম স্থান যথা লগ্ন থেকে ৯ম স্থান কে বিবেচনা করতে হবে।সুতরাং আমাদের রাশি ও নভমসা উভয় কুষ্টিতেই ২য় স্থান ও তার পতির পরিস্থিতি লক্ষ্য করা প্রয়োজন।কিছু মানুষ ৯ম স্থানকে জ্যোতিষশাশ্ত্রে দ্বিতীয় বিবাহের স্থান বলে গণ্য করেন কারণ ৯ম স্থান হল ৭ম স্থান থেকে তৃতীয়। 

কিছু মানুষ ১১তম স্থানকে জ্যোতিষশাশ্ত্রে দ্বিতীয় বিবাহের স্থান হিসেবে ব্যবহার করার উপদেশও দেন।কিন্তু প্রখ্যাত জ্যোতিষী শ্রী সঞ্জয় রথের মতে ২য় স্থানকে দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিৎ এবং আমিও বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে এর সত্যতা খুঁজে পেয়েছি। পাঠকেরা ২য়,৯ম অথবা ১১ তম স্থানকে দ্বিতীয় বিবাহ গণনার জন্য ব্যবহার করে তার পরিণাম দেখতে পারেন।

উপপদ লগ্ন থেকে ৮ম স্থান জ্যোতিষশাশ্ত্রে দ্বিতীয় বিবাহকে সূচিত করে। সুতরাং উপপদলগ্ন থেকে ৮ম স্থান দ্বিতীয় সঙ্গী ও তার সঙ্গে সম্পর্কের সাথে যুক্ত মায়াকে প্রদর্শন করে।

কিন্তু আমাদের একটা জিনিস অবশ্যই মনে রাখতে  হবে, প্রথম বিবাহের সমাপ্তির পরেও আমরা ৭ম স্থানকে অবজ্ঞা/অবহেলা করতে পারিনা।এটি শরীরের যৌন অঙ্গগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এটি বিবাহের খুব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কুষ্টিতে একাধিক বিবাহের বিন্যাস

  • ৭ম স্থানে একাধিক গ্রহের অবস্থান, বিশেষত রাহুর মতো গ্রহ এর সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।
  • যদি ২য় ও ৭ম স্থানের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব থাকে তখন একাধিক বিবাহ ঘটতে পারে।
  • ৭ম পতি ৪র্থ স্থানে অবস্থান করলে বা ৯ম পতি ৭ম স্থানে অবস্থান করলে তা দ্বিতীয় বিবাহের ইঙ্গিত।
  • মঙ্গল+শুক্র যখন ৭ম স্থানে থাকে ও ৭ম পতি ৮ম স্থানে থাকে এবং শনির অবস্থান ১২তম স্থান হয়, তখন তা জ্যোতিষশাশ্ত্রে একের বেশি বিবাহের ইঙ্গিত বলে ধরা হয়।
  • দশা-অন্তর্দশা অবশ্যই পুনর্বিবাহকে সমর্থন দেয়।
  • যখন ৭ম পতি উচ্চস্থ হয় এবং ভার্গোত্তম হয় তখন দ্বিতীয় বিবাহের সম্ভাবনা থাকে।
  • যদি ৭ম স্থান দ্বৈত রাশি হয় অথবা ৭ম পতি দ্বৈত রাশিতে অবস্থান করে তখন একের বেশি বিবাহ ঘটতে পারে। মিথুন,ধনু এবংমীন দ্বৈত রাশি বলে পরিচিত।

সুখী পুনর্বিবাহের শর্তাবলি

যদি লগ্নের ২য় স্থান শক্তিশালী হয় এবং ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত হয়, তখন তা দ্বিতীয় বিবাহে খুশি আনতে পারে।

যখন নভমসায় ২য় স্থান ও তার পতি শক্তিশালী হন এবং তার উপস্থিতি লাভজনক হয় তখন সেটি শুভ দ্বিতীয় বিবাহের ইঙ্গিত।

উপপদ লগ্নে ৮ম স্থানকে দ্বিতীয় বিবাহের জন্যগণ্য করতে হবে।যখন এই স্থানে শুভ দৃষ্টি থাকে এবং এর পতির অবস্থান শুভ হয় তখন সুখী দ্বিতীয় বিবাহের ইঙ্গিত প্রদর্শন করে। আমাদের এই নতুন উপপদের ২য় স্থান যেমন উপপদলগ্নের ৯ম স্থানকে লক্ষ্য করতে হবে।জ্যোতিষশাশ্ত্রে একটি শুভ দ্বিতীয় বিবাহের জন্য উপপদলগ্নের ৯ম স্থানে কোনো ক্ষতিকর গ্রহের উপস্থিতি থাকা উচিৎ নয়।

আমরা কিভাবে বৈদিক জ্যোতিষশাশ্ত্রে দ্বিতীয় বিবাহ কে বিবেচনা করব সেই সম্বন্ধে আমি কিছু তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করলাম।কিন্তু এদের আক্ষরিক ভাবে ব্যবহার করবেন না। জ্যোতিষশাশ্ত্রের নীতি গুলি বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। আমাদের কে দৃষ্টিকোণ, সংযুক্তি, বিভাগীয় কুষ্টি, নক্ষত্র, প্রভৃতি দিক থেকে একে বিবেচনা করতে হবে।

যদি আপনার প্রয়োজন হয় তবে আমার কাছে জ্যোতিষশাশ্ত্রের পরামর্শ নিতে পারেন এবং বিবাহ গণনা করাতে পারেন।

যদি আপনি মনে করেন যে আমি কিছু বাদ দিয়েছি, তাহলে মন্তব্য করতে ভুলবেন না। যদি আপনার এটা পছন্দ হয় তবে শেয়ার করুন।



Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.

Scroll to Top